দেশের মাটি শুধু মাথায় ঠেকানোর জন্য নয়….


প্রথম কিস্তি

“গিলি তো?” 
“কোই ভি”, গ্রামের কামুক বিত্তবান মানুষটি বলে। 
“গিলি তো বড়কি।” ঘোষিত হয়ে যায়।

এই গ্রামে টস করার জন্যে কয়েন ব্যবহার হয় না। ঢেলার একদিক থুথুতে ভিজিয়ে আকাশপানে ছুঁড়ে দেন মেয়েদুটির বাবা। সকলে দৌড়ে যায় ঢেলাটি যেখানে মাটিতে পড়েছে। 
“গিলি”, বাবাই ঢেলাটি তুলে নিয়ে দেখে বলেন। অর্থাৎ বড়কি। মিসেস প্যাটেল হওয়ার আশঙ্কা সত্যি হওয়ায় ভেঙে পরে বাপের এই “জিগর কি টুকড়া”টি। অন্যটি তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।

বিশাল ভরদ্বাজের ‘পটাখা’ ছবিটির এই দৃশ্য খুব একটা কষ্টকল্পিত নয় ভারতের অন্য একটি প্রান্তে। উত্তর-পূর্ব। একদিকে যেমন সেখানে আছে মেঘালয়ের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ, তেমনি আছে অরুণাচল প্রদেশের কিছু জনজাতি, যাদের মেয়েদের বিনিময়মূল্য নির্ধারিত হয়ে যায় খুব ছোট থাকতেই। বাপের দেওয়া কথার খেলাপ করা সম্ভব নয় কোনোভাবেই, তাই নারীত্বের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মেনে নিতে হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো বৃদ্ধের সঙ্গে বিবাহ ও সহবাস। কারণ সেই বৃদ্ধ মানুষটিই তো সবথেকে বেশি অর্থমূল্য দেবেন পিতাকে তাঁর কন্যাসন্তানটিকে বিবাহযোগ্যা করে তোলার জন্যে। অনেকটাই ‘পটাখা’র প্যাটেলের মতো, যে এক দুই মেয়ের বাবার থেকে চাওয়া বনদফতরের আধিকারিকের ঘুষের টাকা বিনা প্রশ্নে তুলে দেয়. যেকোনো একটি মেয়েকে বিয়ে করার অগ্রিম যৌতুক হিসেবে।

অরুণাচলের এমনই একটি জেলাশহর কোলোরিয়াং। নামেই জেলাশহর, ভারতবর্ষেরই অনেক বর্ধিষ্ণু গ্রামের থেকেই দরিদ্র সে। ইটানগর বা জিরো থেকে গাড়িতে ‘মাত্র’ বারো ঘন্টার পথ। সেই কোলোরিয়াং-এর ইয়ানিয়ার (নাম পরিবর্তিত) প্রেম হলো BRO-এর জনৈক জওয়ানের সঙ্গে। ছেলেটি বিহারের। প্রেমিকার পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবে রাজি হয়না সে। ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’ দেখে ফেলেছিলো যে। ইয়ানিয়ার বাপের সামনে গিয়ে বিয়ের জন্যে মেয়ের হাত চায় জগন।

বাপের কাছে খবর ছিল আগের থেকেই। কিন্তু শহরের সবচেয়ে বড়লোক, বুড়ো তারিয়াক ইয়ানিয়াকে তাঁর স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার জন্যে অগ্রিম দিয়ে গেছে যখন ইয়ানিয়ার মাত্র পাঁচ বছর বয়স, এখন মেয়ে বড় হয়ে বাইরের কোন ছেলেকে তুলে নিয়ে আসলেই হলো! তা সে হোক না সরকারি চাকরিওয়ালা এক টগবগে যুবক, যে কিনা পাহাড়ের মেয়েকে ভোগ না করেও বিয়ে করে নিয়ে যেতে চায়! আজব ভালোমানুষ। তারিয়াকের কাছে খবরটা পৌঁছনোর আগেই এর একটা হেস্তনেস্ত করতে হতো বাপকে। জগনকে বসতে বলে ভেতরে যায় সে। পেছন থেকে টাঙ্গির এক কোপে যে তাঁর মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দেবে ইয়ানিয়ার বাপ, সে কথা জগনের মাথায় আসেনি।

কয়েকদিনের মধ্যেই ইয়ানিয়ার নাম যোগ হয় তারিয়াকের স্ত্রীদের তালিকায়, পনেরো নম্বরে।

দ্বিতীয় কিস্তি

আবার টস করে দেখি কয়েনের অন্য পিঠ।

“এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে”, তখনও বোধহয় ব্যাঙ্কের শিলঙ আপিস খোলেনি। এক খাসি যুবক, নাম ধরা যাক ফিরনাই, স্টেশন রোড গুয়াহাটিতে অবস্থিত ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাত তারা কার্য্যালয়ে (সেভেন সিস্টার্স-এর প্রত্যেকটির জন্যে একটি তারা) কাজে লেগে পড়ে। না, তাই বলে ভাববেন না যে ফিরনাই সেই অসংগঠিত ক্ষেত্রের অগণিত শ্রমিকদের মধ্যে কেউ, যার প্রতিদিন কাজ পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সে ব্যাঙ্কে ম্যানেজার পদে নিযুক্ত হয়েছে। প্রথম পোস্টিং গৌহাটি। বাড়ির কাছেই, সপ্তাহান্তে সেখানে পাড়ি জমানো মোটেই কঠিন নয়। কিন্তু এতো কিছু সত্বেও ওর মুখে হাসি নেই। বিশেষ করে সোমবারগুলোতে মুখ কালো করে অফিসে ঢোকে। “Monday morning blues” বলে প্রথমদিকে উড়িয়ে দেওয়া গেলেও যখন সোম থেকে মঙ্গল থেকে বুধে ছড়াতে থাকে ওর মনখারাপ, সেটাকে আর অবহেলা করা চলে না।

“কী হয়েছে, স্যার একটু বলবেন?” পঞ্চাশোর্ধ জনৈক সহায়ক একদিন প্রশ্ন করেই বসেন। 
“আমি এ চাকরি আর করবো না। “
“সে কী? কেন? অন্য কোনো চাকরি পেলেন?”
“না। গ্রামে ফিরে যাবো।”
“বাড়িতে কোনো সমস্যা? বাবা মা ঠিক আছেন তো?”
“সবাই ভালো আছে, আমিও ভালো থাকবো। চাকরি করা সম্ভব না।”
সেদিন আর কথা বাড়াননি ভদ্রলোক।

ফিরনাইকে আমি দেখি প্রায় একই সময়ে, ততদিনে শিলঙ অফিস খুলে গেছে, আমরা কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গেছি জাতীয় স্কুল ক্যুইজ ‘RBIQ’-এর প্রথম বছরে। গৌহাটি আর শিলঙ-এ একদিনের ব্যবধানে কুইজ। তার আগেই কুইজমাস্টার ব্যারি ও’ব্রায়েন ও Somnath Dasguptaর সঙ্গে জমে উঠেছে আলাপ, ইম্ফলে প্রথম কুইজের সুবাদে। বরং গৌহাটি অফিসের জনাদশেক মানুষ ছাড়া আর কারো সাথে পরিচয় হয়নি। এবারে সেই সুযোগটা পাওয়া গেলো। বিগত বছর দুয়েকের মধ্যে চাকরিতে ঢোকা কয়েকজনের মধ্যে ফিরনাইয়ের বিষণ্ণ মুখটাও চোখে পড়েছিল। তারপর বিত্তীয় বাজার বিভাগে কাজ শুরু করার পর যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে ক্ষেত্রীয় অফিসগুলোর সঙ্গে।

২০১৬তে উত্তর-পূর্বে বদলি। সেই গৌহাটিতেই ঘাঁটি, কিন্তু চরকির মতো ঘুরতে হচ্ছে সাত রাজ্যে। শিলঙ-এর পুলিশ বাজারে এক সহকর্মীকে দেখলাম এক স্থানীয় যুবকের সঙ্গে কথা বলতে। অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু ছেলেটিকে চেনা চেনা লাগছিলো তাই চলে যেতে জিজ্ঞেস করলাম ওনাকে।

“ও তো স্যার আমাদের অফিসে ছিলো। গ্রেড বি ডি আর। রেজিগনেশন দিলো। এখন এখানেই আছে, বিয়ে করেছে।”
“কী করছে এখন?”
“কিছু না। বৌ বলে দিয়েছিলো চাকরি যদি করতেই হয় শিলঙ-এ করো। আর গৌহাটিতে গিয়ে পরে থাকলে বিয়ে করার কথা ভুলে যাও। এখন বৌয়ের কাছেই থাকে। ফাই ফরমাশ খাটে, নেশা ভাঙ করে এই আর কী।”

বুঝলাম যে পিতৃ হোক বা মাতৃ, কোনো তন্ত্রই ব্যক্তিস্বাধীনতার ধার ধারে না।


তৃতীয় কিস্তি

তা সে যে তন্ত্রই মেনে চলুক, ইম্ফলের ইমা মার্কেট প্রথমবার দেখে তাক লেগে যায়। পুরোপুরি মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত রেস্তোরাঁ আমাদের শহরেই আছে, সুরুচির এঁচোড়ের কাটলেটের সুখ্যাতি শুনেছি অনেক, চেখে দেখা হয়নি। মহিলারা এ শহরের বেশ কিছু দুর্গাপূজা, দাতব্য চিকিৎসালয় ইত্যাদি নিয়মিত পরিচালনা করে আসছেন, তাও নেহাত কম সময় ধরে নয়। মুম্বাইতে ওলা উবারের পাশাপাশি চলে প্রিয়দর্শনী ক্যাব, চালক ও যাত্রী দুজনেই যেখানে নাম ভূমিকায়। কিন্তু এর সবকিছুই কেমন যেন আরোপিত, গোদা বাংলায় আমরা যাকে inorganic বলে থাকি।

একথা বলছি না যে প্রাচীনত্বই organic হয়ে ওঠার একমাত্র শর্ত, কিন্তু যখন কেউ ঠিকঠাক ভেবেই উঠতে পারেন না ঠিক কোন সময়ে মেইতেই সম্প্রদায়ের মহিলারা বসতে শুরু করেন এই চত্বরে তাঁদের কাপড়ের গাঠরি বা মাচানের কুমড়োশাক নিয়ে, কারণ সে তো ব্রিটিশদের হাতে টিকেন্দ্রজিতের ফাঁসির (১৮৯১) অনেক আগের কথা, এমনকি ব্রিটিশরা এদেশে আসারও আগেই শুরু হয়ে গেছিলো ইমা কেইথেল বা ‘মায়ের বাজার’, তখন মেয়েদের সমানাধিকার নিয়ে প্রচলিত প্রশ্নগুলো পাত্তা পায় না আর। কমবেশি ৫০০ বছর এখানে মণিপুরের এই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মহিলারা, এবং শুধুই তাঁরা একটা গোটা, জ্যান্ত এবং এখনো বাড়তে থাকা বাজার চালিয়ে আসছেন, পাল্টাতে থাকা সময়ে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেই।

বাড়তে থাকা বললাম বুঝি? নিশ্চয় ভুল করে ফেলেছি, এ তো আর ২৫ লক্ষ স্কোয়ার ফিটের লুলু আন্তর্জাতিক শপিং মল নয়, যেখানে দ্বিশতাধিক ‘এ বলে আমাকে দ্যাখ’ ব্র্যান্ডের বিপণি; এখানে বাজার বলতে ছাউনি দেওয়া টানা কংক্রিট স্ল্যাবের উপর তাঁদের বাড়িতে তৈরী (কিছু মেড ইন লুধিয়ানা সামগ্রীও পাবেন নিঃসন্দেহে) পণ্য সাজিয়ে নিত্যদিন ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকা পাঁচ হাজার রমণী। ইচ্ছে করেই শব্দে লিখলাম, পাছে যদি মনে হয় একটা শূণ্য বেশি বসিয়ে ফেলেছি। এহেন ইমা কেইথেলে ঢুকলে অন্যদের কি হয় জানি না, আমার রোমকূপগুলো হরষিত হয়। আর ভারতের অন্য প্রান্ত থেকে আসা শখের পর্যটক বলুন বা পাইকারি হারে চাদর কিনতে আসা ভিনরাজ্যের চাকুরে, যখন দরাদরি করতে গিয়ে ‘মায়েদের’ হাতের আদুরে চাপড় খেয়ে যান চোখের সামনে, তখন স্থান কাল পাত্রী ভুলে দুই পক্ষের অমলিন হাসিতে যোগ দিই। তবে সব বিক্রেতাদের মেজাজ যে এক তারে বাঁধা তা তো নয়, তাই গড়িয়াহাটের ফুটপাথে বাজার করার মানসিকতা নিয়ে ইমা কেইথেলে না ঢোকাই শ্রেয়। কেন সে তা ব্রিটিশদের জিজ্ঞেস করুন।

এই বাজারের শুরু সম্ভবতঃ এমন এক সময়ে, যখন মেইথেই সম্প্রদায় আশেপাশের হিংস্র পাহাড়ি উপজাতিগুলোর আক্রমণ সামলে নিজেদের শাসনকে পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন এবং আমরা চিত্রাঙ্গদার মতো দু- একটি চরিত্র দেখতে পাচ্ছি রাজপরিবারে। মুশকিল হলো প্রথমে আত্মরক্ষা ও তারপরে রাজ্যের পরিধি বাড়ানোর জন্যে যুদ্ধ বিগ্রহে নামতে হয় মণিপুররাজেদের, আর সেখানে প্রয়োজন পড়ে শক্তসমর্থ সৈনিকদের। এদের অবর্তমানে চাষবাস থেকে গ্রাসাচ্ছাদনের অন্যতর যাবতীয় ব্যবস্থা করতে হতো বাড়ির মেয়েদেরই, অগত্যা ইমা কেইথেল। তো সেই মধ্যযুগ থেকে নানান ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে একই জায়গায় চলতে থাকে কেনাবেচা, ইম্ফলের অন্য প্রান্তে তৈরী হয় আবার ধ্বংসও হয় কাংলা দুর্গ (বর্তমানে এর ভগ্নাবশেষটি রাষ্ট্রীয় স্মৃতিসৌধর মর্যাদা পেয়েছে), মাঝখান থেকে গোল বাধায় ব্রিটিশেরা। ঔপনিবেশিকদের সেই এক বীজমন্ত্র, দাও স্থানীয় অর্থব্যবস্থাকে ঘেঁটে। টিকেন্দ্রজিতকে সরিয়ে দেওয়ার পর মনিপুরের সিংহাসনে বসানো হয় এক ক্রীড়ণককে। তাঁর মদতে ব্রিটিশরা মনিপুরের ধান থেকে তৈরী চাল পাঠাতে থাকে নিজেদের সামরিক শিবিরগুলোয়। প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন ইমা কেইথেলের মহিলা ব্যবসায়ীরা। নুপী লান বা মহিলাদের যুদ্ধ দমন করতে প্রশাসক চেষ্টা করেন ইমা কেইথেলের জমিবাড়ি বহিরাগতদের বিক্রি করে দিতে। প্রতিরোধ আরো শক্ত হয়ে ওঠে এই আক্রমণে। ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, অগত্যা ব্রিটিশেরাই রণে ভঙ্গ দেন।

শাসক বদলায়। বদলায় সেনাবাহিনীর উর্দির রঙ, অস্ত্র। ইমা কেইথেল আর মণিপুরের মেয়েরা থেকে যান তাঁদের নিজস্ব পরিচয় নিয়ে। ২০১৬। ইরম শর্মিলা চানুর অনশন চলছে তখনো। হঠাতই তিনদিনের হরতালের ডাক দেয় মণিপুরের নাগরিক সংগঠনগুলি। এখানেও আলাদা মণিপুর। মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলির বন্ধের ডাক সাড়া ফেলে না এখানে। তো সেই ভরা বন্ধের বাজারে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আমাদের ত্রৈমাসিক বৈঠক। আগেরদিন দুই জীপ ভর্তি কম্যান্ডোবাহিনীর পাহারায় বিমানবন্দর থেকে হোটেলে এসে পৌঁছেছি। মিটিং সকাল এগারোটায়, হাতে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে পাইলট বাহনকে সামনে রেখে আমাদের কনভয় বেরিয়ে পরে হোটেল থেকে। বড়ো রাস্তায় পরে বাঁদিকে মিটার পঞ্চাশেক দূর থেকে ইউ -টার্ন নিতে হবে। ঠিক সেখানে রাস্তার মাঝখানে উবু হয়ে বসে এক অশীতিপর বৃদ্ধা। কনভয় যখন কুড়ি মিটারের দূরত্বে, বৃদ্ধা নিজের ডান হাত তুলে চার আঙ্গুলের ভাষায় ফিরে যেতে বলেন। মন্ত্রের মতো কাজ হয়। জনা পনেরো সশস্ত্র পুলিশ কম্যান্ডো ও আমরা বাধ্য ছেলের মতো ঘুরিয়ে নিই আমাদের গাড়ির মুখ। স্বাধীন দেশে সম্মানজনক পশ্চাদপসরণ সম্পন্ন হয় বিনা রক্তপাতে তো বটেই, একটিও শব্দের অপচয় না করে।

চতুর্থ কিস্তি

“কোনো যুদ্ধই প্রমাণ করে না কে ন্যায়ের পক্ষে ছিল, যুদ্ধ প্রমাণ করে কে বেশি জোর খাটাতে পেরেছিলো”- একটি প্রাচীন চৈনিক প্রবাদ

পশ্চাদপসরণ সেই প্রথম বা শেষ নয়। শহরে নয়, জঙ্গলের আইন যেখানে মানানসই, সেই জঙ্গলেও নয়।

বাঘের জঙ্গলে কিছু সাধারণ নিয়ম আছে। বহিরাগতদের জন্য। সাধারণত সে সব আমি মেনে চলি। কারণ মেনে না চলার স্বাধীনতা থাকেনা সবসময়। সেবারে ছিল।

ভারতের যেখানেই বেড়াতে যান, অল্প, অর্ধ অথবা অশিক্ষিত গাইড সম্প্রদায় আপনাকে ঠিকই খুঁজে নেবে। মনোরঞ্জনের নামে এদের অতিরঞ্জন ইদানিংকার জনৈক রবিজীবনীকারের কথা মনে করায়। আগেরদিন বনবিভাগের কুশল কর্মচারীদের সঙ্গে সিতারাকে ধাওয়া করা গেছে। অন্যদের শরীরে যেটা লম্বাটে ডোরা, এই বছর দুয়েকের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটির বাঁ চোখের উপরে সেই কালোদাগ একদম ষ্টার অফ ডেভিডের মতো। তার থেকেই নাম সিতারা। পরবর্তীতে ইনি রণথম্ভোর জাতীয় উদ্যানের আলফা মেল হয়ে উঠবেন কী না সে সময়ই বলবে, আপাততঃ তাঁর এক পূর্বতনের গল্প শোনাচ্ছিলেন আমাদের সেদিনকার স্থানীয় গাইড রণছোড়দাস।

স্থানীয় দুর্গ পরিসরেই রঘুনাথ মন্দির। মন্দিরের একদিক খোলে জাতীয় উদ্যানের কোর এলাকার মুখে। রণছোড় ওবামাকে চেনেন না, কনিষ্ঠ বুশকেও নয়। তাঁর শুধু মনে আছে একবার ক্লিনটন সাহেব এসেছিলেন এই তল্লাটে। নিজের গাড়ি থেকে সে সময়ে জঙ্গলের রাজা T২৩কে মন্দির চত্বরে বসে থাকতে দেখে বিল নাকি বলেছিলেন, “হোয়াট এ ম্যাগনিফিসিয়েন্ট ক্রিয়েচার। আই উইশ উই হ্যাড হিম ইন দ্য হোয়াইট হাউজ।” 
রণছোড় বলেন পরদিন থেকে T২৩কে আর দেখা যায়নি।

সত্যি হলেও এ ঘটনা যখন ঘটার কথা, তখনো কোর এলাকায় পর্যটনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি, সওয়াই মাধোপুর থেকে শুরু করে দিল্লী পর্যন্ত অনেক স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের পিকনিক থেকে সামার ক্যাম্প, সবকিছুই চলতো জাতীয় উদ্যানের খাসতালুকে। চলতো কারণ সুলতান, বর্তমান T৭২, তখন মানুষ মেরে ওঠেনি একজনও, ফলে আইন বা প্রাণভয় কোনোটাই বাধা হয়ে দাঁড়াতো না।

সুলতানের ব্যাপারে কানাঘুষো, ইউটিউব ভিডিও সব সেই ২০১৪তেও ছিল। কিন্তু, সুলতান তো থাকবে গভীর জঙ্গলে আর ঝুমর বাউড়িতে আমাদের বনবাস কোর এলাকা থেকে অনেকটাই দূরে, ম্যাপ সেরকমটাই বলে। জঙ্গলে ঢোকার বড়রাস্তা থেকে ঢুকে যাওয়া সার্ভিস রোডে প্রায় মাইল দুয়েক গেলে রাণাদের একসময়কার মৃগয়া নিবাস ঝুমার বাউড়ি। আশেপাশের গ্রামের লোকেদের কল্যাণার্থে একসময় কুয়ো বানিয়েছিলেন রাণারা, পরে তারই পাশে তৈরী করেন এই ছোটোখাটো প্রাসাদটি। সাফারির খরচকে সামাল দিতে অন্য সব অরণ্যবিহারে আমি সাধারণতঃ সাদামাটা হোটেলেই থাকি, কিন্তু ঈশান স্যারের কল্যাণে সেবারে সাফারি হবে প্রায় নিখরচায়। ওনারা না আসলে অবশ্য আমাদের বরাতে ছিল ২০-আসনবিশিষ্ট ক্যান্টার, জঙ্গলের বেশিরভাগ সুঁড়িপথে যার প্রবেশ মানা। বনবিভাগের জিপসি হোক বা আমজনতার ক্যান্টার, সেসব পাওয়া যাবে দ্বিতীয়দিন সকালে, প্রথমদিন বিকেল চারটেয় আমরা যখন বাউড়িতে এসে পৌঁছই তখন সব গাড়িই বেরিয়ে পড়বে জানা ছিল। অগত্যা রিসেপশনে জিজ্ঞেস করা হলো সার্ভিস রোড ধরেই খানিক হেঁটে আসা যায় কি না।

“হাঁ, হাঁ আরামসে জাইয়ে। সির্ফ অন্ধেরা হোনে সে পহলে বাপিস আ জাইয়েগা।” শুনে আমাদের আর পায় কে? 
প্রায় মিনিট কুড়ি হাঁটার পর বড়ো রাস্তায় গজিয়ে ওঠা একটা নতুন রেসর্টের পেছনদিকটায় পৌঁছেছি, তখনি পচা মাংসের একটা মৃদু গন্ধ নাকে এলো। বাকিরা দেখলাম ভ্রূক্ষেপহীন, একটু আগে দেখে ফেলা একটা বড়োসড়ো নীলগাই নিয়ে আলোচনায় মশগুল। ঠিক তারপরেই সামনে ফুট তিরিশের দূরত্বে হলদে হয়ে যাওয়া লম্বা ঘাসের ঝোপের মধ্যে একটা বেশ তাগড়াই কোনো জন্তুকে ছায়ার মতো সরে যেতে দেখতেই ওখানে আটকে গেলাম। উল্টোদিক থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা মোটরবাইকে চেপে দুটি স্থানীয় ছেলে আসছিলো, তার মধ্যে পেছনের জন আমাদের কাছে আসতেই প্রবল উত্তেজনায় দু হাত উঁচিয়ে বলে উঠলো, “সাহাব, দেখা আপনে, শের গয়া, শের গয়া।” শের যে গেছিলো সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতেই আমরা আবারো কোনো শব্দ খরচ না করেই পশ্চাদপসারী হই।

সুলতান হোক বা সুলতানের ছায়া, ত্রিশ ফুটের দূরত্বে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় চারজন হৃষ্টপুষ্ট সাবালক ও তিন নাবালিকাকে দেখেও যে সেদিন একেবারেই আগ্রহ দেখায়নি, তার কারণ খুব কাছেই একটা প্রাপ্তবয়স্ক চিতলের মড়ি খেয়ে শেষ করে এসেছিল ও। জঙ্গলের কিছু আইন থাকে, জঙ্গলের বাসিন্দাদের জন্য। সুলতান সে আইন মেনেছিল বলেই আইনভাঙা আমরা কয়েকজন সেদিন অক্ষতদেহে বাউড়িতে ফিরি।

কিন্তু আলফা মেল সুলতান তার আগে ও পরে কম করে চারজন মানুষ মেরেছে বলে শোনা যায়, ওর পঞ্চম শিকার বলে সন্দেহ করা হচ্ছিলো যে বনকর্মীর শরীর, তাঁর বধ্যভূমিতে টি২৪ উস্তাদকে দেখা যেতেই সরকার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেন যে এই ‘নরখাদক’কে সজ্জনগড় চিড়িয়াখানায় সরিয়ে দেওয়াই শ্রেয়। ন’বছরের উস্তাদের প্রাকৃতিক রাজত্বে ফি বছর লক্ষাধিক পর্যটক আসা যদি বন্ধ হয়ে যায় সেই চিন্তা থেকেই হয়তো।

জঙ্গলের আইন সভ্য দেশে চলতে পারেনা বেশিদিন। শেষমেশ জঙ্গলকেই তাই পিছু হঠতে হয়।

Posted in

Leave a comment